Last Updated on September 9, 2026 by ডা. বুলবুল ইসলাম 'ঈসা
পায়ের নখের একপাশ হঠাৎ ব্যথা করছে, জায়গাটি লাল হয়ে ফুলে গেছে, জুতা পরলে বা হাঁটলে ব্যথা আরও বেড়ে যাচ্ছে—এমন সমস্যাকে অনেকেই সাধারণ নখের সমস্যা মনে করেন। কিন্তু নখের কিনারা যখন পাশের ত্বকের ভেতরে ঢুকে গিয়ে সেখানে চাপ, প্রদাহ ও ব্যথা সৃষ্টি করে, তখন সেটিকে বলা হয় Ingrown Nail, বাংলায় প্রচলিতভাবে নখকুনি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে অন্তঃবর্ধিত নখও বলা হয়।
নখকুনি সাধারণত পায়ের বড় আঙুলে বেশি দেখা যায়। শুরুতে সামান্য ব্যথা বা অস্বস্তি থাকলেও সময়ের সঙ্গে আক্রান্ত স্থানে ফোলা, লালভাব, ক্ষত, অতিরিক্ত মাংসের মতো টিস্যু এবং কখনো সংক্রমণের মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে। তাই শুরুতেই সমস্যাটিকে গুরুত্ব দিয়ে নখের সঠিক পরিচর্যা করা প্রয়োজন।
নখকুনি কেন হয়?
নখকুনির অন্যতম প্রধান কারণ হলো ভুলভাবে নখ কাটা। নখের কোণা খুব গভীর করে গোল করে কাটলে নখের নতুন অংশ ত্বকের দিকে বাড়তে পারে। আবার নখ অতিরিক্ত ছোট করে কাটলেও একই সমস্যা হতে পারে।
এছাড়া খুব আঁটসাঁট জুতা বা মোজা পরলে পায়ের আঙুলের ওপর এবং নখের পাশে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এই চাপ নখের কিনারাকে পাশের ত্বকের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
কারও কারও নখ স্বাভাবিকভাবেই বেশি বাঁকা বা চওড়া হয়। নখের গঠনগত এই বৈশিষ্ট্যের কারণেও বারবার নখকুনি হওয়ার প্রবণতা থাকতে পারে। পায়ের আঙুলে আঘাত লাগা, নখে চাপ পড়া বা নখের স্বাভাবিক বৃদ্ধির পরিবর্তনও কখনো এর কারণ হতে পারে।
এছাড়া অতিরিক্ত ঘাম, পায়ের অপর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতা এবং দীর্ঘসময় ভেজা অবস্থায় থাকা নখের আশপাশের ত্বকে সমস্যা তৈরি করে পরিস্থিতিকে আরও অস্বস্তিকর করে তুলতে পারে।
নখকুনির লক্ষণ কী কী?
নখকুনির প্রথম দিকের লক্ষণ সাধারণত নখের একপাশে ব্যথা ও চাপ লাগার অনুভূতি। বিশেষ করে হাঁটার সময় বা জুতা পরলে ব্যথা বেশি অনুভূত হতে পারে।
পরবর্তীতে আক্রান্ত স্থানে—
লালভাব দেখা দিতে পারে
নখের পাশের ত্বক ফুলে যেতে পারে
স্পর্শ করলে ব্যথা হতে পারে
ত্বক নখের ওপর উঠে আসতে পারে
ক্ষত বা কাঁচা জায়গা তৈরি হতে পারে
অতিরিক্ত মাংসের মতো টিস্যু দেখা দিতে পারে
কখনো তরল বা পুঁজজাতীয় নিঃসরণ হতে পারে
হাঁটা বা জুতা পরা কষ্টকর হয়ে উঠতে পারে
দীর্ঘদিনের নখকুনিতে বারবার প্রদাহ হওয়ার কারণে নখের আশপাশের ত্বক আরও সংবেদনশীল ও অস্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে।
নখকুনি হলে কী কী অসুবিধা হতে পারে?
প্রথমদিকে সমস্যাটি ছোট মনে হলেও অবহেলা করলে ব্যথা ও প্রদাহ ক্রমে বাড়তে পারে। আক্রান্ত স্থানে ক্ষত তৈরি হলে সেখানে জীবাণু প্রবেশ করে সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে ফোলা, উষ্ণতা, পুঁজ এবং ব্যথা বাড়তে পারে।
বিশেষ করে যাদের পায়ে রক্ত চলাচল বা ক্ষত শুকানোর সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে পায়ের যেকোনো ক্ষতকে অবহেলা করা উচিত নয়। অতিরিক্ত ব্যথা, দ্রুত ছড়িয়ে পড়া লালভাব, পুঁজ, জ্বর বা আঙুলের উল্লেখযোগ্য ফোলা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
নখকুনি প্রতিরোধে কী করবেন?
নখকুনি প্রতিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিকভাবে নখ কাটা। পায়ের নখ খুব ছোট করে বা একেবারে কোণা গোল করে না কেটে তুলনামূলকভাবে সোজা করে কাটা ভালো। নখের কোণা ত্বকের অনেক ভেতর পর্যন্ত কেটে ফেলা উচিত নয়।
পায়ের আঙুলে পর্যাপ্ত জায়গা থাকে এমন আরামদায়ক জুতা ব্যবহার করা উচিত। দীর্ঘসময় এমন জুতা ব্যবহার করা ঠিক নয় যাতে বড় আঙুলের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
প্রতিদিন পা পরিষ্কার রাখা এবং ধোয়ার পর ভালোভাবে শুকিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আঙুলের ফাঁকে যেন অতিরিক্ত আর্দ্রতা জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। নিয়মিত মোজা পরিবর্তন করা এবং অতিরিক্ত ঘাম হলে পা শুকনো রাখার চেষ্টা করাও উপকারী।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নখের পাশে ব্যথা বা ফোলা শুরু হলে নিজে ব্লেড, কাঁচি বা অন্য কোনো ধারালো বস্তু দিয়ে নখের ভেতরের অংশ কাটার চেষ্টা না করা। এতে ক্ষত ও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
নখকুনির হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা কেমন?
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় নখকুনির ক্ষেত্রে শুধু “নখের পাশে ব্যথা” এই একটি লক্ষণের ওপর ভিত্তি করে সবার জন্য একই প্রেসক্রিপশন নির্ধারণ করা হয় না। রোগীর ব্যথার ধরন, ব্যথার স্থান, চাপ বা স্পর্শে পরিবর্তন, হাঁটার সময়ের অবস্থা, প্রদাহের প্রকৃতি, ক্ষত বা নিঃসরণের ধরন, নখের গঠন, পূর্ববর্তী ইতিহাস এবং রোগীর অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে রোগীর Totality of Symptoms তৈরি করা হয়।
বিশেষ করে একই ধরনের নখকুনি হলেও একজনের ক্ষেত্রে যে উপসর্গগুলো প্রধান, অন্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে সেগুলো নাও থাকতে পারে। তাই ব্যক্তির সামগ্রিক উপসর্গের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হোমিওপ্যাথিক প্রেসক্রিপশন নির্বাচন করা হয়।
তবে নখের কিনারা যদি ত্বকের মধ্যে গভীরভাবে ঢুকে যায়, প্রচুর পুঁজ হয়, তীব্র প্রদাহ থাকে বা বারবার একই সমস্যা ফিরে আসে, তাহলে শুধু ঘরোয়া পরিচর্যার ওপর নির্ভর না করে সরাসরি চিকিৎসকের শারীরিক পরীক্ষা প্রয়োজন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নখের আক্রান্ত অংশের যথাযথ চিকিৎসা বা ছোট একটি প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
শেষ কথা
নখকুনি বা Ingrown Nail দেখতে ছোট একটি সমস্যা হলেও এর কারণে দীর্ঘদিন ব্যথা, হাঁটতে অসুবিধা এবং নখের আশপাশে বারবার প্রদাহ হতে পারে। সঠিকভাবে নখ কাটা, আরামদায়ক জুতা পরা, পা পরিষ্কার ও শুকনো রাখা এবং নখের পাশে নিজে থেকে কাটাকাটি না করা—এসব অভ্যাস নখকুনি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ।
আর যদি নখকুনি বারবার হয় বা দীর্ঘদিন ধরে থাকে, তাহলে সমস্যাটিকে শুধু স্থানীয় নখের সমস্যা হিসেবে না দেখে রোগীর সম্পূর্ণ উপসর্গ বিবেচনা করে চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় রোগীর ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য ও Totality of Symptoms অনুসারে চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়। নিজের ইচ্ছায় কোনো ওষুধ গ্রহণ না করে নির্ভরযোগ্য হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।