ভুমিকা
মাসিক বা পিরিয়ড বন্ধ থাকা বা দেরিতে হওয়ার কারণ লক্ষণ ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা জানা আজকাল নারী মাত্রেই অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। মাসিক বা পিরিয়ড নারীদের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাধারণত ২৮-৩৫ দিনের মধ্যে একটি নারীর মাসিক হয়। তবে অনেক সময় কিছু কারণবশত মাসিক দেরিতে হতে পারে বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এটি সাময়িক বা দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা হতে পারে এবং নারীর স্বাস্থ্যের উপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
মাসিক বা পিরিয়ড বন্ধ থাকা বা দেরিতে হওয়ার কারণ
মাসিক বা পিরিয়ড বন্ধ থাকা বা দেরিতে হওয়ার বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে কিছু কারণ প্রাকৃতিক, আবার কিছু স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণে ঘটে।
প্রাকৃতিক কারণ:
- বয়ঃসন্ধি: প্রথম দিকের মাসিক অনিয়মিত হতে পারে, যা স্বাভাবিক।
- গর্ভাবস্থা: এটি মাসিক বন্ধ হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
- মেনোপজ: বয়স ৪৫-৫৫ এর মধ্যে পৌঁছালে মাসিক স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
জীবনধারা সম্পর্কীয় কারণ:
- অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
- অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস
- অত্যধিক ব্যায়াম
- শরীরের অতিরিক্ত ওজন হ্রাস বা বৃদ্ধি
শারীরিক সমস্যা:
- পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS): এটি মাসিক অনিয়মের অন্যতম সাধারণ কারণ।
- থাইরয়েড সমস্যা: হাইপোথাইরয়েডিজম বা হাইপারথাইরয়েডিজম মাসিক চক্রে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
- হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের ভারসাম্য নষ্ট হলে মাসিক দেরিতে হতে পারে।
- ডায়াবেটিস: অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস হরমোনের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
- প্রসব বা গর্ভপাতের পরবর্তী সময়: গর্ভপাতের পর অনেক সময় মাসিক অনিয়মিত হয়ে যেতে পারে।

মাসিক দেরিতে হওয়ার বা বন্ধ থাকা কত প্রকার ও তার ব্যাখ্যা
মাসিক অনিয়মিত হওয়ার বিভিন্ন ধরণ রয়েছে। সাধারণত নিম্নলিখিত তিনটি প্রধান ধরন দেখা যায়:
১. অলিগোমেনোরিয়া (Oligomenorrhea):
এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে মাসিক চক্র ৩৫ দিনের বেশি সময় পরপর হয় বা খুব কম পরিমাণে রক্তপাত হয়। এর কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS)
- হরমোনের ভারসাম্যহীনতা
- অত্যধিক শারীরিক পরিশ্রম
- দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ
২. আমেনোরিয়া (Amenorrhea):
যখন একজন নারীর মাসিক তিন বা ততোধিক মাস পর্যন্ত একদম বন্ধ থাকে, তখন তাকে আমেনোরিয়া বলা হয়। এটি দুই ধরনের হতে পারে:
- প্রাইমারী আমেনোরিয়া: যদি ১৫-১৬ বছর বয়স পর্যন্ত প্রথমবারের মতো মাসিক না হয়।
- সেকেন্ডারী আমেনোরিয়া: পূর্বে মাসিক স্বাভাবিক থাকলেও কোনো কারণে হঠাৎ করে ৩ মাস বা তার বেশি সময় ধরে বন্ধ হয়ে গেলে। এর কারণগুলো হতে পারে:
- গর্ভাবস্থা
- মেনোপজ
- ওজন অত্যধিক হ্রাস
- থাইরয়েডের সমস্যা
- হাইপ্রোল্যাকটিনেমিয়া (প্রোল্যাকটিন হরমোনের অতিরিক্ত নিঃসরণ)
৩. ডিসমেনোরিয়া (Dysmenorrhea):
এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে মাসিক অনিয়মিত হওয়ার পাশাপাশি প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয়। এটি দুই ধরনের হতে পারে:
- প্রাইমারী ডিসমেনোরিয়া: সাধারণত কিশোরীদের মধ্যে বেশি দেখা যায় এবং এটি হরমোনজনিত কারণে হয়।
- সেকেন্ডারী ডিসমেনোরিয়া: এটি সাধারণত প্রজনন সংক্রান্ত জটিলতার কারণে হয়, যেমন এন্ডোমেট্রিওসিস বা পেলভিক ইনফ্লেমেটরি ডিজিজ (PID)।

মাসিক বা পিরিয়ড বন্ধ থাকা বা দেরিতে হওয়ার লক্ষণ ও সম্ভাব্য জটিলতা
যদি মাসিক অনিয়মিতভাবে দেরিতে হয় বা একদম বন্ধ হয়ে যায়, তবে তা দেহের অন্যান্য উপসর্গের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এসব লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়।
মাসিক বন্ধ থাকার লক্ষণ:
- অনিয়মিত মাসিক বা একদম বন্ধ হয়ে যাওয়া
- তলপেটে ব্যথা বা ভারী অনুভূতি
- অতিরিক্ত চুল পড়া বা শরীরে অবাঞ্ছিত লোম বৃদ্ধি
- ত্বকের সমস্যা (ব্রণ, তৈলাক্ততা)
- স্তনের সংবেদনশীলতা
- মানসিক অবসাদ বা হতাশা
সম্ভাব্য জটিলতা:
- বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি বৃদ্ধি
- রক্তস্বল্পতা
- হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়া (অস্টিওপোরোসিস)
- হৃদরোগের ঝুঁকি
মাসিক বা পিরিয়ড বন্ধ থাকা বা দেরিতে হওয়ার প্রাকৃতিক নিরাময়

মাসিক চক্র নিয়মিত রাখতে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং কিছু প্রাকৃতিক উপায় অনুসরণ করা যেতে পারে।
স্বাস্থ্য্যক খাদ্যাভ্যাস:
- পর্যাপ্ত পানি পান করা
- ভিটামিন বি, আয়রন ও প্রোটিনযুক্ত খাবার গ্রহণ
- পর্যাপ্ত শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া
নিযমিত ব্যাযাম ও শারীরিক চর্চা:
- নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করা (যোগব্যায়াম, হাঁটা ইত্যাদি)
- শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
- পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা
মানসিক চাপ কমানোর উপায়:
- ধ্যান ও মেডিটেশন
- মানসিক চাপ কমানোর জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম
- ইতিবাচক জীবনধারা অনুসরণ করা
কখন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন?
- পরপর তিন মাস মাসিক না হলে
- গর্ভাবস্থা সন্দেহ হলে
- অতিরিক্ত ব্যথা বা রক্তপাত থাকলে
মাসিক বন্ধ থাকা বা দেরিতে হওয়ার (Amenorrhea/Delayed Menstruation) হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা

মাসিক বন্ধ থাকা বা দেরিতে হওয়ার (Amenorrhea/Delayed Menstruation) সমস্যায় ব্যবহৃত ১০টি হোমিওপ্যাথিক ওষুধ ও তাদের শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ নিচে দেওয়া হলো:
১. Pulsatilla (পালসেটিলা)
শারীরিক লক্ষণ:
- অনিয়মিত বা বিলম্বিত মাসিক, রক্তস্রাব হালকা ও পরিবর্তনশীল।
- ঠাণ্ডা লাগলে বা পায়ে ভিজে গেলে মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া।
- তৃষ্ণাহীনতা, চর্বিযুক্ত খাবারে অরুচি।
মানসিক লক্ষণ:
- আবেগপ্রবণ, কান্নাকাটি করা, সান্ত্বনা চাওয়া।
- পরিবর্তনশীল মেজাজ, অন্যের সহানুভূতি পেলে ভালো বোধ করা।
২. Sepia (সিপিয়া)
শারীরিক লক্ষণ:
- মাসিক বিলম্বিত বা কম হয়ে আসা, তলপেটে শূন্যতা বা ভারের অনুভূতি।
- যৌনাঙ্গে শুষ্কতা, সহবাসে অনীহা।
- লিভার ও জরায়ুর দুর্বলতা, কোমরে ব্যথা।
মানসিক লক্ষণ:
- বিরক্তি, পরিবারের প্রতি উদাসীনতা।
- একাকীত্ব পছন্দ করা, মানসিক ক্লান্তি।
৩. Conium (কোনিয়াম)
শারীরিক লক্ষণ:
- মাসিক ধীরে ধীরে কমে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া।
- বয়সের কারণে বা হরমোনাল সমস্যায় মাসিক বন্ধ (মেনোপজ)।
- স্তনে বা জরায়ুতে গোটা অনুভব করা।
মানসিক লক্ষণ:
- বিষণ্নতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব।
- স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া।
৪. Graphites (গ্রাফাইটিস)
শারীরিক লক্ষণ:
- স্থূল মহিলাদের মাসিক বিলম্বিত হওয়া।
- ত্বকে শুষ্কতা, চামড়ায় ফাটা দাগ।
- কোষ্ঠকাঠিন্য, ফোলাভাব।
মানসিক লক্ষণ:
- ভীতু, সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা।
- সঙ্গীত বা শিল্পের প্রতি আকর্ষণ।
৫. Lachesis (ল্যাকেসিস)
শারীরিক লক্ষণ:
- মাসিক বন্ধ হওয়ার পরও অস্বস্তি, গরম অনুভব করা।
- বাম ডিম্বাশয় বা জরায়ুতে চাপ বা ব্যথা।
- গলায় টাইট লাগা, ঘাড়ের কাপড় ঢিলা করতে চাওয়া।
মানসিক লক্ষণ:
- অতিরিক্ত কথা বলা, ঈর্ষাপরায়ণতা।
- বিষণ্নতা, বিশেষত মাসিকের আগে বা পরে।
৬. Natrum Muriaticum (ন্যাট্রাম মিউর)
শারীরিক লক্ষণ:
- মাসিক বিলম্বিত বা কম হওয়া, রক্তস্রাব সাদা বা পাতলা।
- মাথাব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য, লবণ খাওয়ার প্রবল ইচ্ছা।
মানসিক লক্ষণ:
- আবেগ গোপন করা, একাকী থাকতে পছন্দ করা।
- প্রিয়জনের প্রতি অতীতের আঘাত মনে রাখা।
৭. Calcarea Carb (ক্যালকেরিয়া কার্ব)
শারীরিক লক্ষণ:
- স্থূলকায়, ঠাণ্ডা লাগা মহিলাদের মাসিক বিলম্বিত হওয়া।
- পায়ে ঘাম, দুধ বা ডিমের প্রতি aversion (অরুচি)।
মানসিক লক্ষণ:
- ভয় পাওয়া, বিশেষত অসুস্থতা বা আর্থিক ক্ষতি নিয়ে চিন্তা।
- ধীরগতি কিন্তু স্থিরমনা।
৮. Bryonia (ব্রায়োনিয়া)
শারীরিক লক্ষণ:
- মাসিক বন্ধ হয়ে গেলে তীব্র মাথাব্যথা বা শুষ্ক কাশি।
- সবকিছুতে শুষ্কতা (মুখ, ত্বক, কোষ্ঠকাঠিন্য)।
মানসিক লক্ষণ:
- বিরক্তি, বিশেষত যখন বিরক্ত করা হয়।
- ব্যবসা বা অর্থ নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা।
৯. Silicea (সাইলিশিয়া)
শারীরিক লক্ষণ:
- দুর্বলতা, মাসিক বন্ধ হওয়া বা খুব কম হওয়া।
- ঠাণ্ডা লাগলে সমস্যা বাড়ে, ঘামে গন্ধ।
মানসিক লক্ষণ:
- আত্মবিশ্বাসের অভাব, কিন্তু জেদি।
- কাজ শেষ করতে ভয় পাওয়া।
১০. Cimicifuga (সিমিসিফিউগা)
শারীরিক লক্ষণ:
- মাসিক বন্ধ হওয়ার পর বিষণ্নতা বা পেশিতে টান।
- জরায়ু ও ডিম্বাশয়ে ব্যথা, বিশেষত ডান দিকে।
মানসিক লক্ষণ:
- অস্থিরতা, ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা।
- অতিরিক্ত কথা বলা, বিষণ্নতা।
এই ওষুধগুলো লক্ষণের সাথে মিল রেখে প্রযোজ্য হলে ব্যবহার করা উচিত। ঔষধ সেবনের আগে অবশ্যই একজন নির্ভরযোগ্য হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
মাসিক বন্ধ বা দেরিতে হলে কী করা উচিত?
প্রথমে জীবনযাত্রার পরিবর্তন করুন, স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ করুন এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা কতদিনে কাজ করে?
এটি ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উপর নির্ভর করে। সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে উন্নতি দেখা যায়।
হরমোনাল ইমব্যালেন্স কি মাসিক বন্ধের প্রধান কারণ?
হ্যাঁ, এটি মাসিক চক্র অনিয়মিত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
পিরিয়ড দেরিতে হলে কী খাবার খাওয়া উচিত?
আয়রন ও ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার, যেমন শাকসবজি, বাদাম, ফলমূল এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা উচিত।
উপসংহার
মাসিক চক্র নারীর স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি দেরিতে হওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া সাময়িক সমস্যা হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সুষম খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করলে এই সমস্যা অনেকাংশে সমাধান করা সম্ভব।
আপনার মাসিক যদি দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মিত থাকে, তবে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
বিঃদ্রঃ “অনিয়মিত মাসিক বা ঋতুস্রাব: কারণ, লক্ষণ ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা” শিরোণামে সমজাতীয় আরো একটি আর্টিকেল রয়েছে আমাদের ওয়েবসাইটে যা আপনার জ্ঞানকে আরো সমৃদ্ধ করবে। আর্টিকেলটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন।