লেখাটা আমার ফেইজবুক পেইজে ১৮ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে পোস্ট করেছিলাম। লেখাটার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে আমার ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করলাম আজ।
শেষে কিছু কথা নতুনভাবে যুক্ত করা হল।
ফেইসবুকে যা লিখেছিলাম সেদিন
Dr. Bulbul Islam ‘Esa
December 18, 2023
…এখন যুগও ডিজিটাল, রোগীরাও ডিজিটাল! প্রায়ই দেখা যায় অনেকে ফেসবুকে বিভিন্ন ঔষধের ছবি, নাম ইত্যাদি লিখে জানতে চায়, এই ঔষধের কাজ কী? এই ঔষধ কী রোগে ব্যবহার হয়? আমার অমুক রোগের জন্য ডাক্তার আমাকে এই ঔষধ দিয়েছে, কাজ হবে তো? ……………ইত্যাদি ইত্যাদি!
অনেকে তো আরো এক কাঠি সরেস! তারা সরাসরি ডাক্তারদের মেসেঞ্জারে এসে এইসব প্রশ্ন করে থাকে, যেখানে রিপ্লাই না দিয়ে থাকা মুশকিল!
এখন এভাবে প্রশ্ন করে অথবা ইন্টারনেট থেকে সেই সব ঔষধের বিষয়ে লেখা আর্টিকেল সমূহ পড়ে রোগী যদি দেখে যে এই ঔষধ তার রোগের সাথে সংগতিপূর্ণ হচ্ছে না- তাহলে কী কী ঘটনা ঘটতে পারে?
১। রোগী ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিবে! যদিও তার অনুসন্ধানে ঔষধটি বেঠিক প্রমাণিত হলেও প্রকৃতপক্ষে ঔষধটি তার জন্য সঠিক ছিল! কারণ, একটা ঔষধে হাজার রকমের সিম্পটম তৈরি করতে পারে, একটা ঔষধকে হাজার রকমের অ্যাঙ্গেল থেকে হাজার ভাবে ব্যবহার করা যায়, যা সাধারণত অনলাইন এর ছোটখাটো আর্টিকেলে পুরোপুরি লেখা থাকে না। এমনকি সে যে সকল চিকিৎসকের কাছ থেকে তার প্রশ্নের উত্তর নিচ্ছে সেই চিকিৎসকরাও হয়ত অনেকেই অল্প পড়াশোনার কারণে সেই ঔষধটির সম্পূর্ণ চিত্র জানে না।
কাজেই এখানে রোগীর ক্ষতি ছাড়া কোন লাভ হলো না।
২। রোগী মনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে ওষুধটি খেতে থাকবে। ফলে তার আরোগ্য বাঁধাগ্রস্ত, প্রলম্বিত, এমনকি সম্পূর্ণ ব্যাহতও হতে পারে! কারণ মনের সাথে শরীরের ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে।
মনের মধ্যে নেগেটিভ চিন্তাভাবনা হলে সেটা শরীরেও প্রতিফলিত হয় যা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।
তাহলে এখানেও রোগীর ক্ষতি বৈ আর কিছুই হলো না।
…আবার দেখা যায়, একটা ঔষধে তার কাজ হয়েছে আর সে সেই ঔষধটার নামও জানে, কাজেই পরেরবার সে আর চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে একটা পাইকারি ওষুধের দোকানে গিয়ে সেই ওষুধটি ফাইল ধরে কিনে ইচ্ছে মতো পেট ভরে খাওয়া শুরু করল! ফলে ওষুধ বৃহৎ মাত্রায় অনন্ত্রিত ভাবে খাওয়ার জন্য আরোগ্য তো দূরের কথা রোগীর অবস্থা আরো জটিল এবং শোচনীয় হয়ে পড়ল!
কাজেই এই সমস্ত নানান কারণে, প্রকৃতপক্ষে রোগীর কল্যাণার্থেই আমরা অনেক চিকিৎসকই রোগীকে ঔষধের নাম বলার ঘোরতর বিরোধী।
নতুনভাবে যা বলছি আজ
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকেরা কেন রোগীকে ঔষধের নাম বলেন না?
আধুনিক যুগে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারের সাথে সাথে স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য খুঁজে পাওয়া খুব সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রোগীরা প্রায়ই বিভিন্ন ঔষধের নাম, কাজ এবং ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন করে থাকেন। এই প্রবণতার ফলে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকরা রোগীকে ঔষধের নাম বলার বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েন। এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।
রোগীরা কেন ঔষধের নাম জানতে চায়?
- অনলাইন তথ্য: ইন্টারনেটে বিভিন্ন ওষুধের বিষয়ে অসংখ্য তথ্য পাওয়া যায়। রোগীরা এই তথ্যগুলি পড়ে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা করার চেষ্টা করেন।
- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম: ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদি মাধ্যমে রোগীরা অন্যান্যের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে এবং ঔষধের পরামর্শ চায়।
- অন্যের পরামর্শ: পরিবার, বন্ধু বা আত্মীয়স্বজনের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীরা নিজে নিজে ঔষধ খেতে চান।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকরা কেন রোগীকে ঔষধের নাম বলেন না?
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যক্তিভিত্তিক হওয়ায় প্রতিটি রোগীর জন্য ঔষধ নির্বাচন করা হয়। ঔষধের নাম না বলার পিছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে:
- ঔষধের জটিলতা: হোমিওপ্যাথিক ঔষধের কাজ এবং ব্যবহার খুবই জটিল। একটি ঔষধ হাজার রকমের লক্ষণের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। অনলাইনে পাওয়া তথ্যগুলি সবসময় সঠিক এবং সম্পূর্ণ নাও হতে পারে।
- রোগীর মানসিকতা: ঔষধের নাম জানার পর রোগীরা অনলাইনে বা অন্যের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে মনে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়তে পারেন। এতে চিকিৎসা প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
- অপব্যবহার: ঔষধের নাম জানার পর রোগীরা নিজে নিজে ঔষধ কিনে খেতে পারেন, যা অপব্যবহারের কারণ হতে পারে।
- চিকিৎসক-রোগীর সম্পর্ক: ঔষধের নাম না বলার মাধ্যমে চিকিৎসক রোগীর উপর আস্থা সৃষ্টি করতে পারেন এবং তাকে চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করতে পারেন।
রোগীকে ঔষধের নাম না বলার ফলে কী হতে পারে?
- রোগীর স্বাস্থ্যের উন্নতি: ঔষধের নাম না জানার ফলে রোগীরা নিজে নিজে ঔষধ খাওয়ার চেষ্টা করবে না এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করবে। এতে রোগীর স্বাস্থ্যের উন্নতি হতে পারে।
- চিকিৎসকের উপর আস্থা বৃদ্ধি: ঔষধের নাম না বলার মাধ্যমে চিকিৎসক রোগীর উপর আস্থা সৃষ্টি করতে পারেন এবং তাকে চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করতে পারেন।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা সম্পর্কিত কয়েকটি সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন ১: হোমিওপ্যাথিক ঔষধ কীভাবে কাজ করে?
উত্তর: হোমিওপ্যাথির মূলনীতি হল “সদৃশ দ্বারা সদৃশকে নিরাময় করা”। অর্থাৎ, যে কোনো রোগের লক্ষণের অনুরূপ লক্ষণ সৃষ্টি করতে পারে এমন একটি পদার্থকে খুব ক্ষুদ্র মাত্রায় দেওয়া হলে সেই রোগ নিরাময় হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি কারও জ্বর আসে এবং সেই জ্বরের সাথে শীতকালে গরম লাগার মতো অনুভূতি হয়, তাহলে এমন একটি ঔষধ দেওয়া হয় যা সুস্থ মানুষকে একই ধরনের লক্ষণ দেয়।
প্রশ্ন ২: হোমিওপ্যাথিক ঔষধের কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কি?
উত্তর: হোমিওপ্যাথিক ঔষধ খুব ক্ষুদ্র মাত্রায় দেওয়া হয় এবং প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি, তাই এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুব কম। কখনও কখনও, ঔষধ খাওয়ার শুরুতে কিছুটা অস্থায়ী অস্বস্তি হতে পারে। একে ‘হোমিওপ্যাথিক অ্যগ্রাভেশন’ বলে। এটি স্বাভাবিক এবং চিকিৎসা প্রক্রিয়ার একটি অংশ।
প্রশ্ন ৩: হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় কত সময় লাগে?
উত্তর: হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার সময় রোগীর অবস্থা এবং রোগের ধরনের উপর নির্ভর করে। কোনো কোনো রোগ দ্রুত সারিয়ে তোলা যায় আবার কোনো কোনো রোগের ক্ষেত্রে সময় লাগতে পারে। তবে, হোমিওপ্যাথি দীর্ঘস্থায়ী রোগের জন্য খুবই কার্যকর।
প্রশ্ন ৪: হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা সকল রোগের জন্য কার্যকর?
উত্তর: হোমিওপ্যাথি অনেক ধরনের রোগের জন্য কার্যকর। যেমন:
- অ্যালার্জি
- ত্বকের রোগ
- পাচনতন্ত্রের সমস্যা
- শ্বাসকষ্ট
- স্নায়বিক সমস্যা
- দীর্ঘস্থায়ী রোগ
প্রশ্ন ৫: হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক কীভাবে রোগ নির্ণয় করেন?
উত্তর: হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক রোগীর সম্পূর্ণ ইতিহাস গ্রহণ করেন। এতে রোগীর শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ, পারিবারিক ইতিহাস, জীবনযাত্রা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত থাকে। এরপর রোগীর লক্ষণের সাথে মিল রেখে একটি উপযুক্ত ঔষধ নির্বাচন করা হয়।
উপসংহার:
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা একটি ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি। রোগীর স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করা খুবই জরুরি। রোগীদের উচিত নির্ভরযোগ্য হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অনলাইন বা অফলাইনে যেনতেন ভাবে পাওয়া কোন তথ্যের ভিত্তিতে নিজে নিজে কোনো ঔষধ খাওয়া থেকে বিরত থাকা।
মনে রাখবেন: স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কোনো বিষয়ে সঠিক তথ্যের জন্য সর্বদা আপনার চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করুন।